উবু হয়ে আছে আজ মানবতা ।

আইলান কুর্দির কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়ার নয় ।আমাদের সবার ই কম-বেশি মনে আছে আইলান কুর্দির কথা । তুরস্কের উপকূলে লাল টি-শার্ট, নীল প্যান্ট ও কালো জুতা পরা নিথর একটি শিশুর দেহ  যার ওপর দফায় দফায় আছড়ে পড়েছিল সাগরের ঢেউ। আইলান কুর্দির নিথর দেহের ঐ ছবিটি সারা বিশ্বের বিবেক কে ভীষন ভাবে নাড়া দিয়ে ছিল ।প্রতিবাদ ও হয়েছিল প্রায় সারা বিশ্বের সভ্য সমাজে । যুদ্ধবিধ্বস্ত  সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াসহ তাদের মিত্রদের ইসলামিক স্টেট ও অন্যান্য সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একের পর এক হামলায়  যখন বিপর্যস্ত  সেখানকার জনজীবন । তখন ই নিজের ও পরিবারে জীবন রক্ষার জন্য ভিটেমাটি ছেড়ে তুরস্কে পাড়ি জমিয়ে ছিল আবদুল্লাহ কুর্দি । পরে তুরস্কের বদ্রাম উপদ্বীপ থেকে নৌকায় করে সমুদ্রপথে গ্রীসে যাওয়ার সময় নৌকাটি ডুবে গেলে সমুদ্রে তলিয়ে যায় আবদুল্লাহর স্ত্রী ও সন্তানরা। কোল ছাড়া হয়ে যায় শিশু আইলান ।পরে সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে শিশু আইলানের মৃতদেহ তুরস্কের উপকূলে পৌঁছায়।শিশু আইলানের মৃতই সিরিয়ার হাজারো  শরণার্থীকে ইউরোপে আশ্রয়ের পথ সুগম করে । কয়েক হাজার শরণার্থী জার্মান-অস্ট্রিয়াসহ কয়েকটি দেশে আশ্রয়ের ও অনুমতি পায়।

 

সিরিয়ার আরেক শিশু ওমরান দাকনিশের ঘটনা ও বিশ্বব্যাপী তুমুল সমালোচনার ঝড় তুলেছে। সিরিয়ার আলেপ্পোয় বিমান হামলার পর একটি বিধ্বস্ত ভবন থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। এরপর তার ঐ উদ্ধরের  ভিডিও আর ছবি প্রকাশ পায় স্যোসেল মিডিয়া সহ বিভিন্ন মিডিয়া। ভিডিওতে আমরা দেখেছি রক্তাক্ত, সারা গায়ে ধূলাবলি মাখা ভীত শিশুটি একটি অ্যাম্বুলেন্সের সিটে বসে রয়েছে, একটু পরেই সে নিজের মুখে হাত বুলিয়ে রক্ত দেখতে পেয়ে চমকে ওঠে । কিনা বিভৎস ছিল ঐ ছবি গুলি । কিন্তু সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে পালিয়া আসার সময় রোহিঙ্গাদের কোন এক মায়ের কোল থেকে হাড়িয়ে যাওয়া শিশুটি কাদা মাটিতে উবু হয়ে থাকা ছবিটি বিশ্বের তেমন কোন বিবেক কে ই হয়তো নাড়া দিতে পারে নি । রোহিঙ্গা এই শিশুটি প্রাণ বাঁচাতে পরিবারের সঙ্গে আরকানের মংডু থেকে নৌকায় করে কক্সবাজার অভিমুখে রওনা হয়েছিল। বিভিন্ন স্যোসেল মিডিয়ায় যদিও বলছে  মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়  শিশুটি । তবে ছবিতে আমি শিশুটির শরীরের কোথাও বুলেটের চিহ্ন বা রক্তের দাগ দেখিনি । দেখেছি কাদা মাটিতে মুখ উবু হয়ে পরে থাকা জলপাই রংগের টি শার্ট পরিহিত একটি নিষ্পাপ শিশুর মৃত দেহ । ছবিতে দেখে আমার মনে হয়েছে এ যেন কোন রোহিঙ্গা শিশু নয় সমগ্র মানব সভ্যতা ই ঐ কাদা মাটিতে মুখ উবু হয়ে পরে আছে । রোহিঙ্গা ঐ শিশুটির মৃত্যুর কারন হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে হয়তো ঐ শিশুটির বাবা মা জীবন বাঁচাতে মংডু থেকে নৌকায় করে কক্সবাজার অভিমুখে রওনা হয়েছিল তখন হয়তো মিয়ানমারের বর্বর সেনাবাহিনী বা বর্বর সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী তাদের অথবা তাদের নৌযানকে ধাওয়া করেছিল ঐ ধাওয়ার কবলে পরে নৌযান টি অথৈ পানিতে তলিয়ে যায় এতে শিশুটির মা বাবা সহ সবাই মারা যায় সেই কারনেই হয়তো আমরা এখনো শিশুটির নাম পরিচয় জানতে পারিনি বা এমন ও হতে পারে বিশ্ব বিবেক ও তাদের মিডিয়া শিশুটির নাম পরিচয় জানার তেমন কোন আগ্রহ দেখায় নি । যাই হউক যে ভাবেই হউক একটি অবুঝ শিশুর কাদামাটিতে পারে থাকা  নিথর দেহ আবারো বিশ্ববাসীকে উপোভোগ করতে হলো । আমি উপোভোগ বলতে বাধ্য হচ্ছি এই কারনেই যে রোহিঙ্গা সমস্যা এটা নতুন কিছু নয় এটা মানবতা ধ্বংসের গত শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া একটি পুরোনো ঘটনা ।

 

২০১২ সালের ১২ জুন নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নোবেল পুরস্কার হাতে নিয়ে অং সান সুচি বলেছিলেন, মিয়ানমারে দীর্ঘদিন অন্তরীণ থাকার সময় তিনি শক্তি ও সাহস অর্জন করেছেন শুধুই  জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার প্রস্তাবনা অনুচ্ছেদের এই কথা গুলো থেকে:  ” মানবাধিকারের প্রত্যাখ্যান ও ঘৃণার ফলে বিশ্বজুড়ে যে বর্বরতার সূত্রপাত হয়, তা থেকে মানুষের বিবেকে জেগে ওঠে প্রবল প্রতিরোধ। সেই প্রতিরোধ থেকে জন্ম নেয় মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা, যেখানে স্পষ্ট ঘোষিত হয়েছে এমন এক বিশ্বব্যবস্থার প্রতি সমর্থন, যেখানে প্রত্যেক মানুষ বাকস্বাধীনতা ও ধর্মবিশ্বাস প্রতিপালনের অধিকার ভোগ করবে এবং ভীতি ও অভাব থেকে মুক্তির অধিকার অর্জন করবে। ” তার ঐ কথার পর বিভিন্ন মানবাধিকার বিশ্লেষকদের ধরনা ছিল হয়তো সামরিক গেরাকলে জিম্মী থাকার কারনেই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘায়িত ও ভয়াবহ আকার ধারন করেছে গনতন্ত্রের পথ উন্মোচিত হলে ই বোধ হয় এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব ।বর্তমান বাস্তবতা, বিশ্লেষকদের ধারনা আর নোবেল পুরস্কার হাতে  সুচির সেই বক্তব্য সব যে পুরোটাই উল্টো । সুচি হয়তো সেদিন শুধু মাত্র নিজের অবস্হার দৃষ্টিতেই ও সব কথা বলে ছিলেন । সুচির নিজের সাথে লঙ্ঘিত মানবাধিকারের কথাই হয়তো সেদিন উপস্হিত মহারথিতের শুনিয়েছিলেন । আজ সুচি বেমালু ভুলেই গেলে ঐ কথা গুলি তা না হলে আজ তিনি সে দেশের ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দু অথচ  তাঁর নিজ দেশের এক সম্প্রদায়ের মানুষের মানবাধিকার আজ চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।চলছে ধর্ষন অগ্নিসংযোগ সহ গনহত্যা । মিয়ানমারে ১৩৫টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মধ্যে রোহিঙ্গা অন্যতম যারা সংখ্যায় প্রায়  পনের লাখের ও অধিক ।মিয়ানমার সরকার তাদের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে স্বীকৃতি তো দেয় ই নাই এমন কি তাদের আদমশুমারি থেকে ও বাদ দেয়া হয়েছে ।

 

অথচ রোহিঙ্গারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ই বাস করে আসছে বর্তামান মিয়ানমারে । ইতিহাস থেকে জানাযায় আরাকানি রাজা নরমেখলা নিজ রাজ্য হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন বাংলার সুলতান জালালুদ্দিন শাহের রাজত্বে এর পর ১৪৩০ সালে বাংলার সুলতান জালালুদ্দিন শাহের সহযোগিতায় রাজা নরমেখলা আবার তার রাজ্য ফিরে পান ।নিজ রাজ্যে ফেরার সময় আত্মরক্ষার জন্য সঙ্গে করে বাংলা থেকে বিশ্বস্ত মুসলমানদের নিয়ে যান, পরে তারাই রোহিঙ্গা নামে পরিচিত হয়। মিয়ানমারের সংখ্যাগুরু বামাররাও  কিন্তু সেখানকার স্হানীয় নয় । আনুমানিক বারোশত বছর আগে তারা ও তিব্বত ও চীনের পার্বত্যাঞ্চল থেকে তৎকালীন ইরাবতী উপত্যকায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন।তাই ধর্মীয় ভাবে এখানকার জনসংখ্যায় সংখ্যাগুরুর স্হান দখল করে আছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ।আর মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনে সেনাবাহিনীর সাথে কিছু বৌদ্ধ ভিক্ষুর নেতৃত্বে জাতীয়বাদী শক্তিগুলো এই অভিযানে অংশ নিচ্ছে । যাদের নেতৃত্বে  আছেন আশিন ভিরাথু নামের সেই ভিক্ষু যিনি নিজেকে মিয়ানমারের বিন লাদেন বলে ঘোষনা দিয়েছিলেন কোন এক সময় । এই  আশিন ভিরাথুর নেতৃত্বে  ই ২০১২ সালে গঠিত হয়েছিল তথাকথিত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যার নাম দেওয়া হয়েছিল ৯৬৯। অথচ বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের  নিতান্তই শান্তিকামী ভাবা হয় । যারা মহামতি গৌতম বুদ্ধের অনুসারী তাই  বৌদ্ধধর্মে মানুষ তো দূরের কথা যেকোনো প্রাণী হত্যাই ভয়ানক অপরাধ। অথচ বুদ্ধের সেই অনুসারীরাই এখন পুরো একটা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে উঠে পড়ে লেগেছে নেমেছে গনহত্যায় । রোহিঙ্গাদের বেলায় ধর্মের চিরন্তন সত্যবানী ও আজ কেন জানি ভূল প্রমানিত হচ্ছে ক্ষমতা আর প্রতিহিংষার কাছে । বিশ্ব বিবেক ও আজ মুখে কুলুপ আর চোখে টিনের চশমা পরে বসে আছে ।

 

 

আমরা দেখতে চাইনা আর কোন আইলান কুর্দির বা নাম না জানা ঐ রোহিঙ্গা শিশুর মত আর কোন শিশুর নিথর দেহ মুখ উবু করে সাগর বা নদীর কুলে পড়ে থকতে । আমরা শুনতে চাইনা রোহিঙ্গাদের মত আর কোন জাতীর উপর বর্বরোচিত নির্যাতনের করুন কাহিনী । দেখতে চাইনা সাগরে ডিঙ্গি নৌকায় ভাসমান কোন শরনার্থীকে । তবে এই মুহুর্তে জাতিসংঘ সহ সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে প্রত্যাশা টা এমন ই  যে সবাই মিলেই রোহিঙ্গাদের রক্ষার জন্য তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য একযোগে মিয়ানমার সরকারের উপর চাপ সৃষ্টিকরে দীর্ঘদিনের জিয়িয়ে থাকা মিয়ানমারের জাতি গত রোহিঙ্গা সমস্যার সুস্ঠ সমাধান করা । তা না হলে  হয়তো এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গিবাদের নতুন অপশক্তি মাথাচারা দিয়ে উঠে আরো নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি দাড় করাতে পারে আমাদের ।

 

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s