রাষ্ট্রকেই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ।

দিন দিন ধর্মীয় ও জাতি গত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা কেমন জানি একটা উৎসবে পরিনত হয়েছে । উৎসব বললাম এই কারনে হাজারো তথাকথিত মানুষ একত্রে জড়ো হয়ে নানা আয়োজনে উৎসবমুখর পরিবেশে চালায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হমলা । বর্তমান সময়ে এমনটির সূচনা হয়েছিল কক্সবাজারের রামু থেকে এর পর ঘটলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে এর রেশ না কাটতেই আবারো একই ঘটনার নতুন অধ্যায় গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে । নাসিরনগর আর মহিমাগঞ্জে ঘটনাই এখন সবচেয়ে আলোচিত । নাসিরনগরের আগুন এখন জ্বলছে । এত কিছুর পর ও কে বা কারা ১৩, নভেম্বর ভোরের আলোর মাঝে ই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে এক হিন্দু সম্প্রদায়ের বসত বাড়ী । এই নিয়ে প্রশাসন ও এলাকার মানুষের ভিতর এক ভৌতিক অনুভূতি কাজ করছে । শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে আগুন সন্ত্রসীদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার পর্যন্ত ঘোষনা করতে হয়েছে । তবে দুঃখজনক হলেও সত্যে গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে সাওতাল জনগোষ্ঠির উপর হামলা হত্যা ও অগ্নি সংযোগের ঘটনায়  মামলা পর্যন্ত হয়নি । গত ৬, নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জে পুলিশ ও স্হানীয় ভুমি দখলদাররা একযোগে হামলা চালায় সাওতাল জনগোষ্ঠির উপর । সংবাদ মাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী যদিও এই হামলায় তিন সাওতাল আদীবাসির জীবন দিতে হয়েছে তবে সওতালদের দাবী নিহতের সংখ্যা নকি আরো বেশি ।গত ৬, নভেম্বর সকাল ১১টার দিকে মহিমাগঞ্জ চিনিকলের তথাকথিত শ্রমিক-কর্মচারীরা পুলিশি পাহারায় সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার-সংলগ্ন এলাকায় জমিতে আখ কাটতে যান৷ তবে খামারের জমিতে থাকা সাঁওতালরা তাঁদের বাধা দেন৷ এতে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং সংঘর্ষ বাধে এতে ই ঘটনার সূত্রপাত । বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের বদৌলতে আমরা দেখছি তথাকথিত মানুষদের হিংস্র রুপ । মানুষ ও কত টুকু জানোয়ার হতে পারে ? আদীবাসি সাওতালদের পিটিয়ে মারার দৃশ্য দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে আমরা বোধ হয় একুশ শতকের ডিজিটাল বাংলাদেশে নয় আমরা আছি হয়তো লক্ষ বছর আগের আদিম যুগে ।

 

১৯৫৬ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার গাইবান্ধার গোবিন্ধগঞ্জ উপজেলার  মহিমাগঞ্জে  ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি মহিমাগঞ্জ সুগার মিলের জন্য অধিগ্রহণ করে যা  সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম নামে পরিচিত। জমি অধিগ্রহণের ফলে  মহিমাগঞ্জের ১৫টি আদিবাসী গ্রাম এবং ৫টি বাঙালি গ্রামের আধিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়।অধিগ্রহনের চুক্তিতে অনুযায়ি অধিগ্রহণকৃত জমিতে আখ চাষ করা হবে তবে আখ চাষ করা না হলে এসব জমি পূর্বের মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে।  অধিগ্রহণের পর বেশ কিছু জমিতে আখ চাষ করা হয়। চাষকৃত আখ দিয়ে চিনি ও উৎপাদন করা হয়। কিন্তু চিনিকল কতৃপক্ষের দুর্নীতি ,অব্যবস্থার ও নানা অনিয়মের কারণে ২০০৪ সালে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরে নানা সময়ে চলে করখানা খোলা আর বন্ধের খেলা । তবে সবচেয়ে মজার ও আশ্চর্যের বিষয় হলো  চিনিকল কর্তৃপক্ষ পূর্বের চুক্তি ও  নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করে ই অধিগ্রহণকৃত জমি বহিরাগত বিভিন্ন প্রভাবশালীদের কাছে ইজারা দিতে শুরু করে। অধিগ্রহণের চুক্তি লঙ্ঘন করে আখের চাষের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে ধান, গম, সরষে সহ অন্যন ফসলাদির চাষাবাদ শুরু করে দখল করীরা ।বিভিন্ন সময় পিতা মাতার ভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষেরা  বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করেন ।এমনি কি আন্দোলনে ও পর্যন্ত নামেন  জনগণের আন্দোলণের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম এলাকা সরেজমিনে তদন্ত করেন। তদন্তে তিনি সেখানকার জমিতে আখের পরিবর্তে অন্য ফসলের   আবাদ দেখতে পান। এর পর থেকে ই নিজেদে ভিটেমাটি ফেরত পারার আন্দোলনে নামেন উচ্ছেদ ও মানুষেরা । আন্দোলনের অংশ হিসেবে উচ্ছেদ হওয়া সাওতাল আদীবাসিরা ২০১৫ সালে সেখানে বসতি স্হপন শুরু করেন ।

 

কথিত আছে কোন এক সময় নাকি দেশের উত্তরাঞ্চাল ছিল এসব গভীর অরন্যে ঘেড়া তীরন্দাজ সাওতালেরাই  বুনো জানোয়ারের সঙ্গে যুদ্ধকরে এই এলাকাকে আবাদি করেছে । সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা কার না জানা ইংরেজ শাসন আমলে স্থানীয় জমিদার, মহাজন ও ইংরেজ কর্মচারীদের অন্যায় অত্যাচারের শিকার হয়ে সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের বিরুদ্ধে প্রথম আন্দোলন গড়ে তোলে।১৮৫৫ সালের ৩০ জুন শুরু হওয়া এই যুদ্ধে  ইংরেজ সৈন্যসহ প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল যোদ্ধা নিহত হয় ।আর সেই থেকেই ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোপ ও শক্তি সঞ্চয় হতে থাকে ভারত বর্ষের মানুষের মনে ।  ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে সিধু, কানু, চাঁদ আর ভৈরবদের জীবনের বিনিময়ের  যে  বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল ২০১৬ সালের নভেম্বরেই আবার সেই ভিটেমাটির জন্য ই জীবন দিতে হলো শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু কে ।

 

একাত্তরের মাহান মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত আর আড়াই লাখ মা বোনের ষম্ভ্রম ত্যহের মিনময় ই অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা । সকল জাতির সম্মিলিত ত্যাগেই অর্জিত আমাদের এই স্বাধীনতা । তাই আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান কাউকেই ছোট করে রাখার বা দেখার অধিকার দেয় নি । তার পর ও বার বার ই লংঘিত হচ্ছে আমাদের সংবিধান । একাত্তরের মাহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্হানী হায়নাদের লুটতরাজ আর অগ্নসংযোগ ছিল মামুলি ব্যাপার তবে এক সাথে একই এলাকার আড়াই হাজার ঘর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা বোধহয় একাত্তরে ও ঘটেনি ।আজ তীরন্দাজ সাওতালদের তীর ছুরাকে ই বড় করে দেখছেন আমাদের আইন শৃংখলারক্ষাকারি বাহীনি । কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন স্বাধীনতার দীর্ঘ দিন পর ও কেন সাওতালদের নিজ ভিটেমাটি রক্ষার জন্য যুবতী মেয়ের ইজ্জত রক্ষার জন্য তীর ছুরতে হবে ?  আজ হাজারো সাওতাল আবাল বৃদ্ধ বনিতা খোলা আকাশের নীচে অনাহারে রাত্রি যাপন করছেন দ্বিজেন টুডু চোখে বুলেটবিদ্ধ হয়ে হাতে পুলিশে হাতকড়া পড়ে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে । যদি আদালত সদয় হয়ে দ্বিজেনের বাধন খুলে দিতে বলেছে । আজ সওতাল শিশুরা স্কুলে যেতে পারছেনা পেটের ক্ষুধানিবারনের জন্য কাজে যেতে পারছেনা  রাস্তায় পর্যন্ত হাটা চলা করতে পারছে না দখলদারদের হুমকি ধমকি আর আইন শৃংখলারক্ষাকারি বাহিনীর নির্যাতনের ভয়ে সত্যি ই এ ঘটনা গুলি আমাদের সভ্য সমাজের জন্য অমানবিক ।আতি সাম্প্রতি সরকারের তরফ থেকে যৎসামন্য ত্রান সামগ্রী বিতরনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মহিমাগঞ্জের সাওতাল পল্লীতে কিন্তু অভিমানি সাওতালরা তা গ্রহন না করে ফিরিয়ে দিয়েছে । আজ অনেক সওতাল পরিবার ই রাগে ক্ষোভে আর ভয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলছে । কেন একটি স্বাধীন দেশ থেকে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠির মানুষের নিজের মাতৃভুমি বা পিতৃভূমি ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করবে ? কেন ই বা মাতৃভুমি বা পিতৃভূমি ছেড়ে ভিন দেশে যাবে ? রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের প্রশাসন কেন তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে ।

একুশ শতকে এসে আমাদের সমাজ তথা রাষ্ট্রের দৃষ্টি ভঙ্গি সম্পুর্ন রুপে পাল্টাতে হবে । ধর্ম বা জাতি হিসেবে সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু কাউকেই হেও করে দেখলে চলবে না । সবাইকেই তার সাংবিধানিক অধিকার পুরিপুরি নিশ্চিত করতে হবে । দল মত নির্বিশেষে সবার জন্য আইনের শাষন প্রতিষ্ঠাকরতে হবে । আমরা চাইবো মহিমাগঞ্জের সাওতালদের ক্ষেত্রে ও আইনের শাষন প্রতিষ্ঠিত হবে । যারাই নিজের ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য এ ধরনের বর্বরোচিত ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের উপযুক্ত বিচার হবে । আমরা চাইবো না সওতালরা তাদের  ছেলে, স্বামী বা পিতা হারানোর বিচার তাদের উপর অত্যাচার নির্যাতনের বিচার রাষ্ট্রের কাছে না পেয়ে তাদের  দেবতা  সিংবোঙ্গা এর কাছে চায় ।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s