এই ক্ষত শুকাবে কেমনে ?

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সেই কালো রাত্রির কথা আজ ও ভুলতে পারেনি কক্সবাজারের রামু ও তার আশ পাশের বৌদ্ধপল্লীর মানুষেরা । উত্তম বড়ুয়া নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননার অভিযোগ এনে সেদিন চালনো হয়েছিল সেখানে নাড়কীয় তান্ডব ।ধ্বংস করা হয়েছিল রামুর ঐতিহ্যবাহী ১২টি বৌদ্ধ বিহার ও আশ পাশের বৌদ্ধপল্লীর মানুষের জান-মাল । দল মতের বিভেদ থাকলে ও সেদিনের হামলায় সবাই একজোট হয়েছিল । ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ঘটনা ও রামুর ঘটনার ব্যতিক্রম নয় ।৩০ অক্টোবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ঘটে গেল আরো এক নাড়কীয় ও কলংকময় ঘটনা । রসরাজ দাস নামের এক যুবকের  ফেসবুকে পবিত্র কাবা নিয়ে ব্যাঙ্গচিত্র পোস্ট করাকে কেন্দ্র করে ঘটে যায় এই নাড়কীয় ঘটনা । রসরাজ দাস তার ফেইসবুকে নাকি কাবা ঘরের উপর শিবের ছবি দিয়ে একটি  ব্যাঙ্গচিত্র পোস্ট করে আর এটাই ঘটনার সূত্রপাত। রসরাজ দাসের শাস্তির দাবিতে নাসিরনগরে বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন ও বিক্ষুব্ধ জনতা সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ ও বিক্ষোভ করে। এ ঘটনায় পুলিশ ২৯ অক্টোবরে সন্ধ্যায় রসরাজকে আটকও করে।পুলিশ আটক করার আগেই  ফেসবুকের আগের ঐ পোস্টগুলো মুছে ফেলেন রসরাজ দাস। সে সময় রসরাজ একটি পোস্ট দিয়ে জানান, কে বা কারা তাঁর আইডি হ্যাক করে পবিত্র কাবা নিয়ে অপকর্মটি করেছে। রোববার সকালে আটক ওই যুবকের ফাঁসির দাবিতে নাসিরনগরে স্থানীয় ” তৌহিদী জনতার ” উদ্যোগে একটি মিছিল বের হয়। আর ওই মিছিল থেকেই হামলা চালানো হয়  আটটি হিন্দু পাড়ায় ভাংচুর ও লুটপাট  হয় অন্তত তিনশটির আধিক হিন্দু সম্প্রদায়ের বসত ঘর  ভেঙ্গে ফেলা হয় প্রাচীন গৌরমন্দির, লোকনাথ মন্দির, কালী মন্দির, মহাদেব মন্দিরসহ অন্তত ১০টি মন্দির ও মন্দিরের ভিতরে থাকা প্রতিমা৷

 

এই ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই গত জানুয়ারি মাসে একজন মাদ্রাসা ছাত্র নিহত হবার ঘটনার জের ধরে ঘটে ছিল আরেক কলংকময় নাড়কীয় তান্ডব । ওই তান্ডবে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছিল শহরের ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতি বিজড়িত একটি সংগীত স্কুল সহ  কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান । ঐ ঘটনার পর সামগ্র দেশের সাংস্কৃতি মনা প্রগতিশীল মানুষ প্রতিবাদ মুখর হয়েছিল প্রতিবাদের বণ্যা বইছিল সাড়াদেশে তবে প্রতিবাদের ফলাফল কি হয়েছে তা পুরোপুরি আমার জানা নেই ? আমার ধারনা ঐ প্রতিবাদ যদি সরকার ও প্রশাসন গুরুত্ব সহকারে দেখতেন তা হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেন বংলাদেশের  কোন প্রান্তেই আর এমন করুন কলংকময় কাহিনী ঘটত না । ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ২৯ অক্টেবর বিকেলে যখন রসরাজ দাসের ফেইসবুক পোস্ট নিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল এবং পুলিশ এসে এ ঘটনার জন্য রসরাজ দাসকে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছিল তখন থেকেই এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে ভয়ের জন্ম নেয়  এমন কিছু ঘটতে পারে মনে করে তারা নাকি পুলিশের সাহায্য ও চেয়েছিল  কিন্তু পুলিশের যথাযথ পদক্ষেপের অভাবেই ঘটে গেল এমন নাড়কীয় কলংকময় তান্ডব ।

 

রসরাজ দাস বা উত্তম বড়ুয়া যেই হউক কারো কোন ব্যক্তি গত অপরাধের জন্য একটি সমাজের পুরো সম্প্রদায়কে কেন খেসারত দিতে হবে ? এর জন্য কি সমাজের পুরো সম্প্রদায় দায়ী ? রসরাজ দাস যেহেতু আগেই স্বীকার করে নিয়েছে যে এ কাজ উনি করেন এবং তার ফেইসবুক আইডি হেক করে অন্যকেউ তাকে ফাসানোর জন্যই এ কাজ করেছে । রসরাজ দাসের বক্তব্য অবিশ্বাসের কিছুই নাই এমন টি হতেই পারে যেখানে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিস্টেম হেক হয়ে মোটা দাগের টাকা দেশ ছাড়া হতে পরে সেখানে  রসরাজ দাসের ফেইস বুক আইডি হেক হওয়াটা মামুলি ব্যাপার । তার পর ও ধরে নিলাম রসরাজ দাস যা বলেছে তা পুরোপুরি ই মিথ্যা । রসরাজ দাস যদি ধর্ম অবমাননার মত এমন ন্যক্কারজন কাজ করতে ই পারে তার জন্য  সেটার বিচার হবে অবশ্যই দেশে প্রচলিত তথ্যপ্রযুক্তি আইন সহ অন্যান্য আইনে । এর জন্য তো কোন সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘর ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা আদৌ কোন ধর্ম সমর্থ করে বলে আমার জানা নেই । আর ইসলাম ধর্ম তো শান্তির ধর্ম এ ধর্মে তো ভাবা ও অকল্পনীয় । বিদায় হজের ভাষণেই তো  প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ(সাঃ) স্পষ্ট বলেছেন যে, একজনের অপরাধে সেই ব্যক্তির পুরো সম্প্রদায়কে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। অন্য এক  হাদিসে রয়েছে, যুদ্ধরত নয় এমন বিধর্মীদের কোনো ক্ষতি করা চলবে না। বরং শান্তিপ্রিয় বিধর্মীকে নিরাপদে তার ঘরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব একজন মুসলমানের উপরেই বর্তায়। সূতারাং যারা  নাসিরনগর ,রামু সহ অন্যান্য যে সব ঘটনা ঘটিয়েছে তারা আদৌ কি মুসলমান ? নাকি মুসলমান নামধারী উগ্র মানবতাবিরোধী জঙ্গি ?

 

“আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত ” নামের উগ্রবাদী ধর্মীয় জঙ্গিরা যাদের নেতৃতে নাসিরনগরে হামলা চালানো হয়েছে তারা হয়তো সংখ্যায় অনেক ছিল না বা পুরো নাসিরনগরের মানুষ তাদের সাথে ছিল না কেউ কেউ তাদের এই কাজের বিরোধী ও ছিল কিন্তু কেন তারা পরলো না এ ধরনের নারকীয় তান্ডব থেকে নাসিরনগরকে রক্ষাকরতে ? কেন তারা পরলো না যারা ইসলাম ধর্মের নামে গুন্ডামি করলো ইসলাম ধর্মকে কলংকিত করলো তাদের কে প্রতিহত করতে ? এই মুহুর্তে আমাকে স্মরন করিয়ে দিচ্ছে জ্ঞানতাপস ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ১৯৫০ সালের ঐ ভাষণ  যখন পাকিস্তান সরকারের উস্কানিতে এদেশ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে বিতাড়িত এবং তাদের সম্পত্তি দখল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্ম দেয়া হয়েছিল,  তখন চকবাজারের শাহী মসজিদে জুমার নামাজের বিশাল সমাবেশে  ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একটি ভাষণ দেন।ঐ ভাষনে তিনি  বলেছিলেন , “ যদি কেউ ধর্মগ্রন্থ থেকে প্রমাণ করতে পারে যে শান্তিপ্রিয় বিধর্মীদের উপর হামলা করার নির্দেশ রয়েছে তাহলে আমি আমার নাম পালটে ফেলব। আমি আমার বাড়িতে হিন্দুদের আশ্রয় দিচ্ছি, আমার বাড়িতে আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছি, কারও যদি সাহস থাকে তো পারলে এসে হামলা কর। আপনারা যদি নিজেকে প্রকৃত মুসলমান বলে মনে করেন তাহলে নিজের নিজের বাড়িতে হিন্দুদের আশ্রয় দিন এবং দাঙ্গাকারীদের প্রতিহত করুন, হিন্দুদের জান-মাল রক্ষা করুন।” তাঁর এই সাহসী বক্তব্যের পর চকবাজার এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ হয়ে যায়।

 

৩০ অক্টোবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে একজন সহসী মানুষ ও খুজে পাওয়া যায়নি যিনি চিৎকার করে বলতেন যদি অপরাধ করে থাকে রসরাজ দাস করেছে তার জন্য নাসিরনগরের পুরো হিন্দু সম্প্রদায় দায়ী নয় তবে কেন তোমরা পুরো হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমন করছো ? আর এক জন ও পা বারাবে না তা হলে পা ভেঙ্গে দিব । তাহলে হয়তো ধর্মের নামধারী ও গুন্ডাবাহীনি আর এক কদম ও এগোতে সাহস পেত না । কারণ ওরা তো কাপুরুষ আর কাপুরুষদের শাসাতে একজন বীর পুরুষ ই যথেষ্ট । হুতো সেই বীর পুরুষের হুংকারেই  রক্ষাপেত হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘড় ও উপাসনালয় রক্ষাপেত মুসলমানের সুনাম ও ঐতিহ্য ।  পীর আউলিয়া বাউল-বৈষ্ণবে বাংলাদেশে  সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস অনেক দীর্ঘ । মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, মঠ এখানে পাশাপাশিই অবস্থান করছে । হিন্দু মুসলিম একই ঘাটের জল খেয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে । রোজা ঈদ পূজা ও আমরা এক সাথে পালন করছি । তার পর ও কেন তথা কথিত ধর্মীয় উগ্রবাদের অপশক্তি বার বার নষ্ট করছে আমাদের  সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ? আমাদের মহান মুক্তি যুদ্ধের ও তো অন্যতম মূল মন্ত্র ছিল  সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা । তার পর ও বার বার মনের ভিতর শুধু একই প্রশ্ন বার বার ঘুর পাক খায় স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর ও কেন আমরা রক্ষা করতে পারছিনা আমাদের  সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ? পাকিস্হানের পেতআত্মা আজ ও ভরকরে আছে আমাদের সমাজের কিছু  উগ্রবাদী, ধর্মের লেবাশধারীদের উপর । তাই সরকার ও তার প্রসাশনকে অবশ্যই সমাজের সর্বস্তরের মানুষদের সাথে নিয়ে এই অপশক্তির মূল চিরতবে উৎখাতকরতে পারনেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে ।

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s