এত টুকুই চাওয়া —— !

একের পর এক খুন সেই সাথে বিভিন্ন অনলাইন ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ সহ নানান ওয়েবসাইডে জঙ্গিগোষ্ঠির দায় স্বীকার এ যেন কোন এক যুদ্ধের ই নতুন রুপ ! আমাদের সরকার তথা রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতর এসব ঘটনা নিয়ে কতটুকু উৎকন্ঠা আছে তা  ইতোমধ্যে যথেষ্ট প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ? সরকার ও তার আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর কর্তাব্যক্তিদের বরাবরই ধারনা যারা ফেইসবুক , ব্লগ সহ নানা মাধ্যমে ধর্ম সহ নানা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন বা করছেন তারা ই বোধহয় মূলত এই ধরনের হত্যার স্বীকার হচ্ছেন !  প্রতিটি এই ধরনের হত্যাকান্ডের পর পর ই সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় একই ধরনের বক্তব্য এসেছে । কে ফেইসবুক বা ব্লগে কি লিখেছে তা খতিয়ে দেখার ই কথা আমরা বার বার শুনে আসছিলাম । তাদের এ ধরনের মন্তব্য পরবর্তীতে যথেষ্ট সমালোচনার জন্মদিলেও তাদের বক্তব্যের ধারা পরিবর্তন হ্য়নি বরং তাদের এ ধরনের বক্তব্য ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে দেশবাসী তথা সমাজের কাছে নতুন করে নতুন নামে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে কোন না কোন ভাবে ভুক্তভোগী কে রাষ্ট্র তথা সমাজের কাছে ধর্মে অবিশ্বাসী হিসেবে ই  বিশেষ পরিচয়ে পরিচিতি করা হয়েছে । সরকারের কর্তাব্যক্তিদের এধরনের মন্তব্য ও বক্তব্য ই বোধ করি অপরাধীদের পার পেতে বা নতুন অপরাধের উৎসাহ সঞ্চার করেছে । ধর্মপরায়ন মানুষের দেশ বাংলাদেশ তাই নাস্তিক তথা ধর্মে অবিশ্বাসীদের হত্যা এদেশের ধর্মপ্রাণ বা ধর্মভীরু মানুষের মনে তেমন আঘাত করে না বরং কোন কোন ক্ষেত্রে উৎসাহিত ও আনন্দিত করেছে ।গত ২০ মে, ২০১৬ আগের সেই একই কায়দায় কুষ্টিয়ায় কুপিয়ে হত্যাকরা হয়েছে হোমিও চিকিৎসক ও লালন ভক্ত মীর সানাউর রহমানকে আর হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও লালন ভক্ত মো. সাইফুজ্জামান ।

 

পূর্বে খুন হওয়া ব্লগার , লেখক , প্রকাশক , পুরোহিত , যাজক , ইমাম বিদেশী নাগরিক সব খুনের ই একই ধরন একটি মটরসাইকেল তিনজন অস্ত্রধারী অতপর অপারেশন কিছুক্ষন পর দায় স্বীকার । মীর সানাউর রহমান হত্যায় ও আগের সব কিছুই বিদ্যমান । তবে সানাউর বা সাইফুজ্জামান কেউ কিন্তু ব্লগার নয় এমন কি তারা বোধ হয় ফেইসবুক সহ কোন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও লেখা লেখি করতেন না । তারা উভয় ছিলেন বাউল সাধক লালনের ভক্ত । তার পরে ও ধর্মীয় উগ্রজঙ্গি গোষ্ঠির হাতে জীবন দিতে হলো তাদের । অবশ্য এর আগে ও বেশ কয়েক জন বাউল সাধকের ভক্তকে একই ভাবে জীবন দিতে হয়েছে ।যদি ও  এসব হত্যাকান্ডকে এখন আর জঙ্গি হামলা হিসেবে মেনে নিতে মোটে ও নারাজ আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় সম্প্রতি তিনি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সাথে কথা বলার সময় এমন মন্তব্য ই করেছেন । তিনি বলেছেন-  ” আমি এখন আর এগুলো জঙ্গিরা করছে বলব না। এগুলো হচ্ছে টার্গেট কিলিং। একেকটা সাবজেক্ট নিয়ে আসছে আর টার্গেট কিলিং করছে। দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্যই এগুলো করা হচ্ছে। আইএস-ফাইএস কিছুই নাই এ দেশে। ”  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের কথায় সুর মিলেয়ে আমি ও বলতে চাই আইএস-ফাইএস কিছু থাকুক চাই না থাকুক তবে এদেশে যে উগ্র ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্ঠি ছিল এবং আছে এটাই বাস্তব সত্য ।

 

বাংলাদেশে যে জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে এদের  পুরোটাই বিদেশ নির্ভর প্রত্যেক জঙ্গিগোষ্ঠীই আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর মদদপুষ্ট ও সহযোগি সংগঠন । তাই প্রত্যেকটা উগ্র ধর্মীয় জঙ্গিসংগঠনের সাথে প্রত্যেকটার কোন না কোন ভাবে সম্পর্ক এবং সম্পৃক্ততা আছে । যাকে আমাদের ভাষায় বলতে পরি সব রসুনের ই এক শিকড় । বিশ্বজুড়ে আইএস ও আল-কায়েদা এখন একটি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় আছে।এই দুই জঙ্গিসংগঠনের প্রভাবেই বাংলাদেশে বিভিন্ন ভিন্নমতাবল্বমীদের উপর হামলা ক্রমানয়েই বড়ছে ।এসব হামলার জন্য সিরিয়া , ইরাক কিংবা আফগানস্হান থেকে প্রশিক্ষিত জঙ্গিদের আসার প্রয়োজন হয়নি কারণ আমাদের দেশে গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন নামে জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান হতে থাকে ।  বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের মূল উৎস ছিল হরকাতুল জিহাদ অর্থাৎ হুজি। আফগান মুজাহিদদের বাংলাদেশি স্বেচ্ছাসেবীদের একাংশ ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে হুজি আর এর মূলে ছিল পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন হুজি। পাকিস্তানে হুজির কার্যক্রম শুরু হয় আশির দশক থেকে কিন্তু এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে এবং পরবর্তী কয়েক বছরে হুজির দ্রুত বিস্তার ঘটে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে। এর পর ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। ১৯৯৬ সালের ১৯ জানুয়ারি কক্সবাজারের উখিয়ায় হুজির ৪১ কর্মী সশস্ত্র অবস্থায় আটকের পরই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বাংলাদেশে উগ্রবাদী কিংবা জঙ্গিগোষ্ঠীর শক্ত অবস্থানের খবর প্রকাশ পায়। এর পর থেকেই বাংলাদেশে শক্ত অবস্থানে আসতে শুরু করে ধর্মীয় উগ্রবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী ও তাদের আন্তর্জাতিক সহযোগীরা। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর শক্ত অবস্থানের বিষয়টি আমরা আরো জানতে পারি ২০০৮ ও ২০০৯ সালে। ২০০৮ সালে আবদুর রউফ দাউদ মার্চেন্ট ও জাহেদ শেখ নামে দুজন ভারতীয় জঙ্গি আটক হয় বাংলাদেশে। ২০০৯ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ভারতীয় কথিত আরেফ রেজা কমান্ডো ফোর্সের মুফতি ওবায়েদুল্লাহ ও হাবিবুল্লাহসহ আটক হয় মোট ছয়জন। তাদের মধ্যে একাধিক জঙ্গিই স্বীকার করে যে, তারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বাস করছে। ওবায়েদুল্লাহ ১৯৯৫ সালে ও হাবিবুল্লাহ ১৯৯৩ সাল থেকে বাংলাদেশে আছেন বলে দাবি করে। এ সময় তাদের সঙ্গে স্থানীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পর্কের বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়। একে একে আনসারউল্লাহ বাংলাটিম, হিযবুত তাহরীর, শাহাদাত-ই-আল হিকমা, জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), জইশ-ই-মোহাম্মদ, হিযবুল মুজাহিদিন, শহীদ হামজা ব্রিগেট ও হিযবুল মাহাদীরসহ নানা নামে নানা সময় জন্ম নেয় উগ্র ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠী ।তবে বাংলাদেশে এই মুহুর্তে বিশেষ ভাবে আলোচিত ও ভংকর রুপ নিয়ে আছে আনসার আল ইসলাম বা আনসারউল্লাহ বাংলাটিম অনেক নিরাপত্তা  বিশ্লেষকের ই ধারনা আনসার আল ইসলাম বা আনসারউল্লাহ বাংলাটিম ই বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেট ( আইএস) এর সহযোগি সংগঠন ।এরা ই ইসলামিক স্টেট এর হয়ে বা ইসলামিক স্টেট এর পক্ষে একের পর এক হত্যাকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে ।গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যার পর থেকে দেশে ধর্মীয় উগ্রজঙ্গিবাদীদের হামলা ও হত্যার হার বেড়েই চলছে । অভিজিৎ রায় থেকে শুরু করে মীর সানাউর রহমান পর্যন্ত অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ থেকে ২০ মে ২০১৬ পর্যন্ত  ধর্মীয় উগ্রজঙ্গিবাদীদের হামলায় জীবন দিতে হয়েছে ৪৪ জনকে ।এক হিসেবে দেখা যায় গত বছরের প্রথম পাঁচ মাসে চারটি হামলায় নিহন হন ১১ জন । এ বছরের একই সময়ে ১৩টি হামলায়  জীবন দিতে হয়েছে ১৪ জনকে ।

 

একের পর পর ঘটে যাওয়া এধরনের নারকীয় ঘটনায় প্রতিবাদের ভাষা ও ভাব কিছুটা ভোতা হবে এটাই স্বাভাবিক ।  সানাউর রহমান হত্যার পর আমরা এমটি লক্ষ করছি । সবার মনেই কেমন জানি এক ধরনের ভয় চোখে মুখে এক ধরনের আতংক এর পরে জানি কার পালা ? সবার ভিতর ই আজ চাপাতি বুলেটের আতংক ।সবার মনেই কেমন জানি এক ধরনের ভয় চোখে মুখে এক ধরনের আতংক এর পরে জানি কার পালা ? জানিনা আমাদের রাষ্ট্র আজ এ ধরনের অপরাধীদের কোন চোখে দেখছে ? এমন টি প্রশ্ন করতে বাধ্য হলাম গত কিছুদিন আগে আমাদের সরকারের তরফ থেকে এধরনের হত্যাকান্ডে সাথে জড়িত ছয় জঙ্গির ছবি সহ বিস্তারিত প্রকাশ করেছে এমন কি তাদের ধরার জন্য পুরুস্কার ও ঘোষনা করেছেন । স্বাভাবিক ভাবে ই প্রশ্ন আসে দূর্ধষ জঙ্গিদের সম্পর্কে সরকার ও তার আইন শৃংখলাবাহিনী এত কিছু জানার পর ও কেন এতদিন গ্রেফতারে ব্যর্থ হলেন ? তার পর ও সরকারকে ধন্যবাদ জানা হয় যে অনেক কিছুর পর হলেও সরকার চাইছে ধর্মীয় উগ্রজঙ্গিবাদ মোকাবেলায় সাধারন মানুষে সাহায্য । আমরা সাধারন মানুষ চাই  নিরাপদ পরিবেশ সুস্হ্য সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্র স্বাবাভিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা । আশা করি আমাদের রাষ্ট্রপরিচালনাকারি সরকার আমাদের সাধারন মানুষে নূন্যতম এই চাওয়া টুকু পূরনে যথাযথ কাজ করবেন ।

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s