পান্থা ইলিশে না মনে প্রানে ই বাঙ্গলী হই ।

পহেলা বৈশাখ এলেই আমারা বাঙ্গলী বাঙ্গলী ভাব ধরি । এক দিনের জন্য আমরা পুরোপুরি বাঙ্গলী সেজে যাই ।বিশেষ করে আমাদের শহুরে মানুষ গুলির ভিতরে ই এই প্রবনতা বেশি । যারা বছরের বাকী দিন গুলি সকালে রুটি জেলী বা অন্য কোন বিদেশি ঢংগের নাস্তায় অভ্যস্ত তারা ও পহেলা বৈশাখের দিন সকালের নাস্তা পান্থা ভাত সাথে ইলিশ মাছের পেটির টুকরো ভাজা দিয়ে মাটির বাসনে ই সাড়ে । যদিও মাটির বাসন আর পান্থা ভাত আমাদের গাঁও গ্রামের মানুষ গুলির ই খাবার তবে তারা বছরে দুয়েক দিন ইলিশ মাছ স্বাদ জিহ্বায় নিতে পারে কি না সেটাই প্রশ্ন ? পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। পহেলা বৈশখা  বাংলাদেশ , ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার বাঙ্গলীরা ই উৎসবের সাথে পালন করে যদিও পহেলা বৈশাখের ইতিহাস ঘটলে জানা যায় যে খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন আর সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় ৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬ থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয় ।কারবারি বা ব্যবসায়িদের কাছে দিন টি  ” হালখাতা ”  বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। বছরের প্রথম দিনে ব্যবসায়ীরা তাদের দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে এ দিন হিসাবের নতুন খাতা খুলেন। এজন্য খদ্দেরদের বিনীতভাবে পাওনা শোধ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এ উপলক্ষে নববর্ষের দিন ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিস্টিমুখ করান। খদ্দেররাও তাদের সামর্থ অনুযায়ী পুরোনো দেনা শোধ করে দেন। বর্তমানে আমাদের এই বাংলা নববর্ষ অনুষ্ঠান নিয়ে কত কান্ড ই না ঘটে যায় । সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে সতের হাজার টাকার একটি ইলিশ । আমাদের দেশে কোরবানির ঈদের আগে পত্রিকার পাতায় সংবাদ শিরোনাম হয় দেশের অমুক গরুর হাটে অমুক ব্যক্তি এত লক্ষ টাকা দিয়ে এই গরুটি কিনেছেন । মাঝে মাঝে সে কি কান্ড এক গরু নিয়ে কয়েক জন অর্থ যুদ্ধে নেমে যান মাত্র সংবাদ শিরোনাম হওয়ার জন্য ঠিক তেমনি বর্তমানে পহেলা বৈশাখের আগে এসে আমাদের ধনী সমাজ ইলিশ কেনার পাল্লায় নেমে যান কে কত দাম দিয় ইলিশ কিনে সংবাদের শিরোনাম হতে পারে ! এ কি না এক নগ্ন অর্থের প্রতিযোগিতা । যেখানে ইংরেজির অত্যচারে বাংলা ভাষা আজ প্রায় ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে  বোরখা হিজাব , জিন্স আর টি-শার্টের আগ্রসনে যেখানে বাংলার ঐতিহ্যবাহি পোষাক আজ বিলুপ্তির পথে  অথচ শাড়ী পড়ে এক দিনের বাঙ্গালী সাজার জন্য সপিং মল আর ফ্যাশন হাউজ গুলিতে ধনীর স্ত্রী-দুলালীরা ধাক্কা ধাক্কিতে অস্হির । বোরখা হিজাব জিন্স আর টি-শার্টের পরিবর্তে একদিনের বাঙ্গালী হওয়ার জন্য শাড়ী, ব্লাউজ ,চুরি, আলতা আরো কত না  কি যা কোন দিন ই কোন পল্লী বধু চোখে ই দেখেনি । পহেলা বৈশাখের সাজের জন্য এক মাস আগ থেকে ই বিউটি পার্লার গুলিতে সিরিয়াল বুকিং । সজতে হবে এক দিনের বাঙ্গলী । বছরে ৩৬৪ দিন যারা ভাবেন পান্থা ভাত শুধু মাত্র ই কাঙ্গালীদের খাবার অথচ একদিনের বাঙ্গালী সাজার জন্য রমনার ধুলা-বলি মিশ্রতি এক বাসন সদ্য রান্না করা অর্ধ ফুটানো পান্থা ভাত খাচ্ছে হাজার টাকা গচ্চা দিয়ে ।

১৯৮৩ সালে সাংবাদিক বোরহান আহমেদে কয়েকজন সমমনা নিয়ে রমনা পার্কে বসে প্রথমবার পহেলা বৈশাখে পান্থা ইলিশ খেয়েছিল । এ থেকেই পহেলা বৈশাখে পান্থা ইলিশ খাওয়া শুরু । আজ এই পান্থা ইলিশ আমাদের ঐতিহ্যের ই যেন একটা বিশেষ অংশ হয়ে দাড়িয়েছে । এবারের পহেলা বৈশাখের দিন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইলিশ মাছ খাবেন না কথা শুনে খুবই খুশি হয়েছি হয়তো আগামীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুষরন করবেন অনেকেই তাতে হয়তো আমাদের ধনীদের পহেলা বৈশাখের প্রতিযোগিতা কিছুটা হলে ও কমবে এতে অনেক ইলিশের ই জীবন রক্ষা পাবে তাতে হয়তো আমাদের গাঁও গ্রামের সাধারন মানুষেরা দুয়েক দিন ইলিশের স্বাদ জিহ্বে নিতে পরবে।

আজ যেখানে আমাদের বাঙ্গলী জাতি সত্ত্বা তথা আমাদের বাঙ্গালী সংস্কৃতি ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে সেখানে এক দিনের বাঙ্গালী হওয়া জন্য কত কি ? এখনো সময় আছে আমাদের জাতি সত্ত্বা আমাদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য শুধু পহেলা বৈশাখে একদিনের জন্য নয় আজীবনের জন্য বাঙ্গালী  হতে হবে । অন্তরে লালন করতে হবে বাঙ্গালীর ঐতিহ্য । তা হলেই আমাদের জাতি সত্ত্বা  তথা আমাদের বাঙ্গালীয়ত্ব টিকে থাকবে আজীবন ।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s