মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গৃহকর্মীদের নির্যাতন বন্ধ করতে পারে ।

গোপালগঞ্জের বড়ফা গ্রামের দশ বছরের মেয়ে লিয়া সংসারে অভাবের তাড়নায় মায়ের কোল ছেড়ে গৃহকর্মীর কাজে আসে ঢাকায় তাদের ই গ্রামের এক প্রভাব শালী ডাক্তারে মেয়ের বাসায় । কিন্তু সেখানে তাকে সামান্য গুঁড়ো দুধ চুরি করে খাওয়ার অপবাদ দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম খুন্তির ছেকা দিয়ে ঝলসে দেয়ে হয় শরীরের বিভিন্ন অংশ সেই সাথে রুটি বানানোর বেলন দিয়ে পিটিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে তার চারটি দাঁত । বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের পেস বোলার শাহাদাত হোসেন ও তার স্ত্রী জেসমিন জাহান নিত্য এখন শ্রী ঘরে অভিযোগ মাহফুজা আক্তার হ্যাপি নামের এগারো বছর বয়সী শিশু গৃহকর্মীকে অমানবিক নির্যাতন । গৃহকর্মী হারিয়ে গেছে মর্মে ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫ বিকেলে মিরপুর থানায় জিডি(সাধারণ ডায়েরি) করেছিলেন ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন। এরপর ওই গৃহকর্মীকে উদ্ধার করলে পুলিশের কাছে সে শাহাদাতের বিপক্ষে শারিরীক নির্যাতনের অভিযোগ করে এবং পুলিশী তদন্তে ও শিশুটির শারীরিক নির্যাতনের প্রমান মিলে। এর পর বিভিন্ন নাটকীয়তা শেষে আদালতে আত্মসমর্পন করে শ্রী ঘরে যেতে হয় ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন ও তার স্ত্রী জেসমিন জাহান নিত্যকে ।প্রতিদিন ই প্রত্রিকার পাতায় খবর হয়ে আসে কোন না কোন লিয়া বা হ্যাপির নির্যাতনের কাহিনী যারা শারীরিক , মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে গৃহকর্ত্রী বা কর্তার দ্বারা । এ নিয়ে মামলা হচ্ছে কিন্তু যাঁরা গৃহকর্মী তাঁরা সবচেয়ে দরিদ্র আর যাঁরা গৃহকর্মী রাখেন অর্থাৎ গৃহ কর্তা বা কত্রী তাঁরা কম-বেশি সম্পদশালী, ক্ষমতাবান৷ মামলা করলেও সেই মামলা চালানোর মতো আর্থিক ক্ষমতা থাকে না নির্যাতিত বা নিহতের পরিবারের৷ তাই তাঁরা শেষ পর্যন্ত সমঝোতা করেন বা মামলা চালাতে না পেরে আইনের ফাঁকে বেরিয়ে ও আসছে । আইন গত ভাবে শাস্তি হউক আর নাই হউক কিন্তু সামাজিক ভাবে নির্যাতনকারীরা যে হেয় ও প্রতিপন্ন হচ্ছেন এটাই বোধ করি সবচেয়ে বড় শাস্তি কারণ যারা এসকল গৃহ কর্মীদের নির্যাতনের ঘটনায় আসামির কাঠগড়ায় দাড়াচ্ছেন তাদের সকলেই সমাজের শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত নাগরিক । আমাদের দেশে কম বেশী প্রায় বিশ লক্ষ গৃহকর্মী গৃহস্থালির কাজের সাথে সম্পৃক্ত যার সিংহ ভাগ ই নারী ও শিশু ।আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব মতে, ২০১৩ সালে অন্তত ১০০ জন গৃহকর্মী বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন৷ এদের মধ্যে ৩৮ জন শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন৷ যাদের মধ্যে আবার ২০ জনের বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে৷শারীরিক নির্যাতনের পর মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের৷ অন্যান্য নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের৷ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তিনজন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে আরো তিনজনকে৷ এছাড়া আত্মহত্যা করেছেন আটজন এবং গর্ভপাতকালে মুত্যু হয় একজনের৷ পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের শেষ চার মাসে ১০৭ জন গৃহকর্মী আত্মহত্যা করেছেন৷বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের তথ্য মতে, ২০১৪ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত সারা দেশে ৫৪ গৃহকর্মী খুন হয় এর অধিকাংশই ধর্ষণের পর। গৃহকর্মে নিয়োজিত মেয়ে শিশুর ওপর ধর্ষণসহ নানা নির্যাতন দিন দিন বাড়ছে। গৃহকর্মে নিয়োজিত প্রায় ৯২ শতাংশই শিশু। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার এক জরিপে বলা হয়, যেসব শিশু শ্রমিক গৃহস্হালীর কাজে রয়েছে তাদের ৫৭ শতাংশ শুধু খাদ্যের বিনিময়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। আর ডোমেস্টিক ওয়াকার্স রাইটস নেটওয়ার্ক-এর হিসাব অনুযায়ী ২০০১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই ৫৬৭ জন গৃহকর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে৷ গৃহ কর্মীদের নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কোন নির্দিষ্ট তথ্যভান্ডার না থাকায় এ সকলের জরিপে বিভিন্ন তথ্যগত অসামনযস্য থাকতে পারে তবে বাংলাদেশে গৃহ কর্মী নির্যাতন যে ভয়াবহ রুপ ধারন করেছে এটা স্পষ্ট ।মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র ২০১২ সালে সরকারের কাছে গৃহকর্মীদের জন্য ” ডোমেস্টিক ওয়ার্কার রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড প্রেটেকশন অ্যাক্ট ” নামে একটি আইনের খসড়া প্রস্তাব করে৷ দেশের সর্বোচ্চ আদালত একটি সুরক্ষা আইন করার নির্দেশ ও দিয়েছে৷ কিন্তু এখনো সরকার সেই আইন করতে পারে নি ৷ একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা মানবাধিকার ও শিশু অধিকারের কথা বলি কিন্তু বাস্তবে কতটুকু এর প্রয়োগ হচ্ছে তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমাদের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী হতঃ দরিদ্র যাদের দিন কাটে অর্ধাহার বা অনাহরে । তাই ক্ষুধায় জর্জরিত বাবা-মা একটু ভালো খাবার, একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশায় তাদের আদরের সন্তানকে তুলে দেন কোন এক ধনী পরিবারে ।আর সেই ছোট্ট শিশু টি সুর্যোদয় থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাড় ভাংগা প্ররিশ্রম মাধ্যমে সম্পর্ন করছে গৃহস্হালীর সমস্ত কাজ কর্ম অথচ সমাজের ঐ সকল মানুষ নামধারী পাষান্ডরা সামান্য ভুলের জন্য ছোট্ট এ শিশু টিকে অমানবিক নির্যাতন করতে একটু ও দ্বিধা বোধ করে না । আমরা কি একবারও ভাবতে পারি না নিজের সন্তানটিকে যে আদর ভালোবাসা দিয়ে বড় করছি, সেই আদর ভালোবাসা পাবার অধিকার আমার গৃহকর্মী শিশুটির ও রয়েছে। গৃহকর্মী আমাদের পরিবারের ই একটি অংশ। তাদেরকে ছোট করে না দেখে আমাদের উচিত একজন মানুষ হিসেবে দেখা, তাদের কাজের স্বীকৃতি দেয়া।এ ছাড়াও গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমাদের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। তাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।আর তাই শুধু আইন করেই গৃহকর্মীদের প্রতি নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয় তার জন্য প্রয়োজন আমাদের মানবিক মননশীলতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি । আর সেই মানবিক মননশীলতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গৃহকর্মীদের নির্যাতনের হার আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অনেকাংশে কমইয়ে আনতে পারে ।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s